বাওবাব পৃথিবীর একমাত্র উল্টো গাছ। লাখ টাকা দামের এই গাছ হাজার বছর বাঁচে।

বাওবাব গাছ

বাওবাব (Baobab) গাছের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Adansoniya digitata. এটি Malvaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এই গাছ কে বোতল গাছ বা উল্টো গাছ ও বলা হয়ে থাকে।


বাওবাব গাছের উৎপত্তি 

পোস্টসূচীপত্রঃসাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে বাওবাব গাছের উৎপত্তি ২ কোটি ১০ লাখ বছর আগে আফ্রিকার মাদাগাস্কারে হয়েছে। পরবর্তীতে এই গাছের বীজ সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের ছড়িয়ে পড়ে। আর তখন থেকেই বিভিন্ন প্রজাতির সৃষ্টি হয়। 

এটি মূলত মাদাগাস্কার, আফ্রিকার সাভানা / সাহেল অঞ্চল এবং অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় পাওয়া যায়। বিশ্ব জুড়ে বাওবাবের ৯টি প্রজাতি রয়েছে। মাদাগাস্কারেই বাওবাবের ৬টি প্রজাতি রয়েছে। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশেষ প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত প্রজাতি হলো Adansoniya grandidieri. অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বাওবাবের কিছু প্রজাতি রয়েছে। সেগুলো স্থানীয়ভাবে Boab tree নামে পরিচিত। এছাড়া শ্রীলংকা এবং ভারতের কিছু অঞ্চলে বাওবাব দেখা যায়। এই গাছ আরব অঞ্চলের কিছু শুষ্ক এলাকাতেও পাওয়া যায়, তবে তা তুলনামূলকভাবে কম। 

বর্তমানে লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাওবাব গাছ কৃত্রিম ভাবে রোপণ করা হয়েছে। 

বাওবাব গাছের বৈশিষ্ট্য

বাওবাব গাছ প্রায় ৫ থেকে ৩০ মিটার উঁচু হয়ে থাকে এবং প্রস্থে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই গাছের ছাল মসৃণ হয়। বাওবাব গাছের কাঠে পানি সংরক্ষণ করার ক্ষমতা থাকে। এই গাছে মৌসুমি পাতা হয়। বছরে মাত্র ৬ মাস পাতা থাকে গাছে। শীতকালে এই গাছের পাতা ঝরে যায়। বাওবাব গাছের পাতা দেখতে হাতের পাঁচটি আঙুলের মতো আকৃতির হয়। বাওবাব গাছে ৫টি পাপড়ি বিশিষ্ট বড় ফুল ফোটে। বাওবাব গাছের ফল লম্বা ও ওভাল আকৃতির হয়। এই ফলের বাহ্যিক আবরণ শক্ত এবং ভেতরে পুষ্টিকর শাস ও বীজ থাকে। বাওবাব গাছের শিকড় অনেক গভীর এবং বিস্তৃত হয়। 

বাওবাব গাছে কত লিটার পানি ধরে 

বাওবাব গাছের কান্ডে স্পঞ্জের মতো কোষ থাকায় তার কান্ডে প্রচুর পানি সংরক্ষণ করে রাখতে পারে। এজন্য এই গাছ কে বোতল গাছ বা জীবন্ত জলাধার বলা হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক বাওবাব গাছ তার কান্ডে প্রায় ১,০০,০০০ লিটার পর্যন্ত পানি ধরে রাখতে সক্ষম। 


শুষ্ক মৌসুমে যখন বৃষ্টি হয় না, তখন টিকে থাকার জন্য এই পানি সাহায্য করে। এছাড়া বাওবাব গাছের মোটা বাকল হয় এবং পাতা অল্প পরিমাণে থাকে, এর কারণে পানি বাষ্পীভবনও কম হয়।

বাওবাব গাছের ফলের পুষ্টিগুণ 

বাওবাব গাছের ফল পুষ্টিগুণে ভরপুর। এজন্য এটিকে সুপারফুড বলা হয়ে থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম বাওবাব ফলে যেসব পুষ্টি উপাদান রয়েছেঃ 

  • ভিটামিন-সি – ৪০০ মিলিগ্রাম। কমলার তুলনায় ৭ গুন বেশি ভিটামিন-সি রয়েছে এই ফলে। ভিটামিন-সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। 
  • ফাইবার – ৪৮% । বাওবাব ফলে উচ্চ তাপমাত্রায় ডায়েটারি ফাইবার রয়েছে। 
  • প্রোটিন – ৩.৩ গ্রাম
  • পটাশিয়াম – ১২৪০ মিলিগ্রাম। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। 
  • আয়রন – ৩.৬ মিলিগ্রাম। বাওবাব ফল আয়রনের একটি ভালো উৎস। এটি রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করে এবং শরীরে অক্সিজেন পরিবহনে সাহায্য করে। 
  • ক্যালসিয়াম – ৩০০ মিলিগ্রাম। দুধের তুলনায় ৪ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম থাকে এই ফলে। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত মজবুত করে। 
  • ম্যাগনেসিয়াম – ৯০ মিলিগ্রাম। ম্যাগনেসিয়াম পেশি ও স্নায়ুর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
  • ভিটামিন বি – ০.৪ মিলিগ্রাম। মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে এবং হরমোন উৎপাদন সাহায্য করে। 
  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট – বাওবাব ফল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। এটি বার্ধক্য বিলম্বিত করে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। 
  • কার্বোহাইড্রেট – বাওবাব ফলে প্রাকৃতিক চিনি থাকে, যা শরীর কে শক্তি দেয়।
  • জিঙ্ক – রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং ক্ষত নিরাময়ে সহায়ক। 

বাওবাব গাছের যত উপকারিতা 

বাওবাব গাছের পুষ্টিগুণ ছাড়াও আরো অনেক উপকারিতা রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু উপকারিতা নিচে দেওয়া হলোঃ

  • বাওবাব গাছের ছাল বিভিন্ন প্রসাধনীতে ব্যবহার করা হয়। 
  • বাওবাব গাছের তেল চুলে পুষ্টি জোগায় এবং মাথার ত্বককে স্বাস্থ্যকর রাখে। 
  • বাওবাব গাছের ছাল এবং কাঠ নৌকা, দড়ি এবং বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। 
  • বাওবাব গাছ মানুষ ও বিভিন্ন জীবজন্তুর জন্য ছায়া ও আশ্রয় প্রদান করে। জীব বৈচিত্র রক্ষা করে। 
  • বাওবাব গাছের শিকড় ব্যবস্থা মাটি ক্ষয় রোধ করে। 
  • ইকো ট্যুরিজমের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হওয়ায়, স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের মাধ্যমে অবদান রাখে। 

বাওবাব গাছের জীবনকাল

বাওবাব গাছের জীবনকাল অবিশ্বাস্যরকম দীর্ঘ হয়ে থাকে। এটি পৃথিবীর দীর্ঘজীবী গাছদের মধ্যে অন্যতম। 


বাওবাব গাছে ফল ধরে ৮ - ২৩ বছর বয়সে। এই গাছ পূর্ণবয়স্ক হতে সময় লাগে ২০০ - ৩০০ বছর। বাওবাব গাছ সাধারণত ১০০০ - ২০০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। বাওবাব গাছের সর্বোচ্চ জীবনকাল ৫০০০+ বছর। কিছু বাওবাব গাছের বয়স ৬০০০ বছর পর্যন্ত বলে ধারণা করা হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত বাওবাব গাছটির নাম ছিলো 'সানল্যান্ড বাওবাব'। এটি ২০১৭ সালে মারা যায়। এই গাছটির জীবনকাল ছিলো ১১০০ বছর।

বাওবাব গাছ দীর্ঘজীবী হওয়ার কারণ

  • বাওবাব গাছের কাণ্ডে প্রচুর পানি জমা থাকায় সহজেই খরা সহ্য করতে পারে এবং খরা প্রবণ এলাকায় খুব ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে। 
  • এই গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি।

বাওবাব গাছের মৃত্যুর কারণ 

বাওবাব গাছ সাধারণত প্রাকৃতিক ভাবেই মারা যায়। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে যে, কিছু বাওবাব গাছ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুত মারা যাচ্ছে। 

বাংলাদেশে বাওবাব গাছ কোথায় পাওয়া যায়

আমাদের দেশে বাওবাব গাছ খুবই বিরল। তবে কিছু জায়গায় এই গাছটি রোপণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে যেসব জায়গায় বাওবাব গাছের দেখা পাওয়া যায় 

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এলাকায়
  • ঢাকার বোটানিক্যাল গার্ডেনে
  • গুলশান বা বনানীর কিছু প্রাইভেট উদ্যানে
  • চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে
  • বাটালী হিল আর্বোরেটামে
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে

এছাড়াও সরকারি বা বেসরকারি নার্সারিতে বাওবাব গাছের চারা পাওয়া যায়। বাওবাব গাছের আদি নিবাস বাংলাদেশে না হলেও বর্তমানে এই দেশে কিছু বাওবাব চাষ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

বাওবাব গাছের দাম কত

বাওবাব গাছের দাম গাছের বয়স, আকার এবং অবস্থানের উপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। যেমনঃ 

  1. ছোট চারার দাম: ৫০০ - ১৫০০ টাকা
  2. মাঝারি চারার দাম: ২০০০ - ৫০০০ টাকা
  3. ৫-১০ বছরের গাছের দাম: ১৫০০০ - ৫০০০০ টাকা
  4. ১০+ বছরের গাছের দাম: ১০০০০০+ টাকা

আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসে ২০০ টি বাওবাব গাছের বীজের প্যাকেট ২১ কুয়েতি দিনার (KWD)। বাংলাদেশের একটি বৃক্ষমেলায় ৮ বছর বয়সী একটি বনসাই বাওবাব গাছের দাম ২ লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের বাওবাব গাছের দাম সাড়ে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। 

বাওবাব গাছের দামের ক্ষেত্রে যে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবেঃ

  1. অঞ্চল ভেদে দাম ভিন্ন হতে পারে 
  2. গাছের স্বাস্থ্য ও অবস্থার উপর দাম নির্ভর করে 
  3. নার্সারি অনুযায়ী দাম কম বেশি হতে পারে 
  4. বাংলাদেশে এই গাছ সহজলভ্য নয়

বাওবাব গাছ নিয়ে যত লোককথা

বাওবাব গাছ নিয়ে এক এক দেশের মানুষের মধ্যে একেক রকম কথা প্রচলিত আছে। এই গাছ সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের প্রচলিত লোককথাগুলো হলোঃ

আফ্রিকার লোককথা

  • ঈশ্বর যখন গাছটি তৈরি করলেন, তখন বাওবাব অহংকার করে নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর ভাবতো। রাগান্বিত হয়ে ঈশ্বর, গাছটিকে উল্টো করে পুতে দিলেন। তখন থেকেই গাছটি এমন অদ্ভুত আকৃতি পেয়েছে। 
  • আফ্রিকার অনেক গ্রামে বাওবাব গাছকে গল্প বলার গাছ বলা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয় - বাওবাব গাছের ছায়ায় বসে বয়োজ্যেষ্ঠরা শিশুদের গল্প শোনা তো। 
  • কিছু আফ্রিকান উপজাতি বিশ্বাস করে যে, বাওবাব গাছের নিচে বসে প্রার্থনা করলে সেটা সরাসরি দেবতার কাছে পৌঁছায়। 

মালি'র লোককথা 

  • একদা একটি শয়তান রাগ করে বাওবাব গাছটিকে উপড়ে ফেলে। কিন্তু গাছটি উল্টো হয়ে আবার মাটিতে পড়ে। তারপর থেকেই এটি উল্টো অবস্থায় বেড়ে উঠেছে। 
  • মালি'র একটি কিংবদন্তি বলেন, বাওবাব গাছের ছায়ায় প্রাচীন যুগে প্রেমিক-প্রেমিকারা মিলিত হতো এবং তাদের ভালবাসা প্রকাশ করতো। তাই কিছু এলাকায় এই গাছকে প্রেমের প্রতীক বলা হয়। 

সেনেগালের বিশ্বাস  

  • বাওবাব গাছের নিচে যদি কেউ মারা যায়, তার আত্মা গাছের মধ্যে বাস করে। তাই এই গাছটিকে পবিত্র মনে করা হয়। 

দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি 

  • যে শিশু বাওবাব ফলের জল দিয়ে স্নান করে, সে কুমিরের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। 

মাদাগাস্কারের বিশ্বাস 

  • বাওবাব গাছে দেবতারা বাস করেন। গ্রামের প্রবীণরা এই গাছের নিচে বসে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। 
  • মাদাগাস্কারের একটা প্রাচীন বিশ্বাস অনুসারে - যারা বাওবাব গাছের নিচে সমাধিস্থ হয়, তারা পরবর্তী জীবনে গাছ হয়ে পুনর্জন্ম লাভ করে। তাই এই গাছটিকে পবিত্র মনে করা হয়। 

জাম্বিয়ার লোককথা 

  • বাওবাব গাছের ফল খেলে মানুষ শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান হয়। তাই প্রাচীনকালে যোদ্ধারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে এই ফল খেতেন।

এছাড়াও এই গাছ নিয়ে অনেকে অনেক রকম কথা বিশ্বাস করেন। কেউ কেউ মনে করেন, বাওবাব গাছ অমরত্বের প্রতীক। তারা বলেন - প্রকৃত অর্থে এই গাছটি কখনোই মারা যায় না। 
আবার, কিছু উপজাতিরা মনে করে - বাওবাব  গাছ পাথরের মত দৃঢ় এবং শক্তিশালী। তারা বিশ্বাস করে, গাছটি মাটির শক্তি শোষণ করে এবং আশেপাশের এলাকাতে সমৃদ্ধ করে তোলে। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এখানে কমেন্ট করুন

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪